ইউএনও’র ছোয়ায় পা‌ল্টে গেল ২৬ গ্রা‌মের চিত্র

  • আপডেট টাইম : মার্চ ১৫ ২০২০, ০০:০৩
  • 307 বার পঠিত
ইউএনও’র ছোয়ায় পা‌ল্টে গেল ২৬ গ্রা‌মের চিত্র

সাইফ আমীন : পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের ১৬ টি গ্রামের মধ্য দিয়ে একে বেকে বয়ে গেছে ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘পাখিমার’ খাল। এই খাল থেকে অন্তত ৭ টি শাখা ইউনিয়নের আরো ১০টি গ্রামে প্রবেশ করেছে। ৫০-৬০ বছর আগে বন্যা ও জলোচ্ছাস থেকে রক্ষা পেতে ‘পাখিমারা’ খালের দুই প্রান্তে বাধ দেয়া হয়। এরপর থেকে শাখা জুগীর খালের মাধ্যমে পাখিমারা খালে আন্ধারমানিক নদের পানি প্রবাহিত হয়ে আসছে। জুগীর খালের এক প্রান্ত আন্ধারমানিক নদে মিলেছে। আরেক প্রান্ত মিলেছে মাখিমারা খালে। খালগুলো মিঠা পানির অন্যতম উৎস। অন্তত ২৬টি গ্রামের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ তাদের জীবিকার জন্য এই খালগুলোর ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল। তাদের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ খালগুলো।
তবে কুমিরমারা গ্রামে জুগীর খালের বিভিন্ন অংশে আড়াআড়ি করে বাঁশের ওপর জাল দিয়ে প্রভাবশালী কয়েকটি পরিবার মাছ ধরতেন। ফলে পানি প্রবাহে বিঘœ ঘটতো। দখলদারদের কারণে গ্রামের বাসিন্দারা খালের পানি ব্যবহার করতে পারতেন না। খালের পানি ছাড়া অন্য কোনো সেচের ব্যবস্থা নেই, তাই বর্ষা মৌসুমে আমন ছাড়া বছরের অন্য সময়গুলো আবাদ হতোনা। সেচের অভাবে বিপুল পরিমাণ জমি অনাবাদি পড়ে থাকতো। ফলে সেসময় গ্রামগুলোর অধিকাংশ পুরুষ মানুষ কাজের সন্ধানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলে যেতেন। দুই যুগের বেশি সময় ধরে এভাবেই চলছিল গ্রামের মানুষগুলোর বেচে থাকার লাড়াই।

অবশেষে প্রায় দুই যুগ পর কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মুনিবুর রহমানের হস্তক্ষেপে দখল মুক্ত হয় খাল। তখন খালের পানি ব্যবহারে আর বাধা না থাকলেও দেখা দেয় আরেক সমস্যা। খালের জলকপাটগুলো (¯øুইস গেট) জরাজীর্ন হওয়ায় জোয়ারের লোনা পানি প্রবেশ করে প্লাবিত হয় খালের দুই পাশের কৃষি জমি। এর ওপর লোনা পানি দিয়ে জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব ছিল না। এবারও তাদের সহায়তায় হাত বাড়িয়ে দেন উপজেলা ইউএনও। খালে বাধ নির্মানে সরকারী তহবিল থেকে টাকাও দেন তিনি। গ্রামের মানুষেরাও সাধ্যমতো চাঁদা চাদা দেন। সেই টাকা দিয়ে খালে লোনা পানির প্রবেশ ঠেকাতে নির্মান করা হয় ৩ টি বাধ। বাধগুলো নির্মানের ফলে গ্রামগুলোর কৃষিতে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। খালের আশপাশের প্রায় ৫০০ একর অব্যবহৃত জমিতে এবার দেখা যাচ্ছে সবুজের সমারোহ। গ্রামগুলো জুড়ে কর্মমুখর পরিবেশ। কেউ বসে থাকেন না। নীলগঞ্জ ইউনিয়ন গোটা উপজেলার মধ্যে কৃষির পাশাপাশি সবজি চাষের মডেল ইউনিয়ন হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। একসময়ের দারিদ্র্যক্লিষ্ট গ্রামগুলো এখন অনেকটা সমৃদ্ধিশালী।

নীলগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, নীলগঞ্জ ইউনিয়নের গ্রামের সংখ্যা ৫২ টি। এরমধ্যে ঘুটাবাছা, নাওভাঙ্গা,গামুরতলা, পূর্বসোনাতলা, নেয়ামতপুর, এলেমপুর,মজিদপুর, ফরিদগঞ্জ সহ ১৬ টি গ্রামের মধ্য দিয়ে পাখিমারা খাল বয়ে গেছে। পাখিমারার শাখা খাল রয়েছে অন্তত ৭ টি। এরমধ্যে জুগীর খাল, হাজীর খাল, মজিদপুর খাল, আমিরাবাদ খাল, জোনাব আলীর খাল সহ ৭ টি খাল ইউনিয়নের আরো ১০ টি গ্রামে প্রবেশ করেছে।

নীলগঞ্জ ইউনিয়নের ১০ টি গ্রামের ১০ জন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ‘পাখিমারা’ খালের দুই প্রান্তে বাধ দেয়া । জুগীর খালের মাধ্যমে পাখিমারা খালে আন্ধারমানিক নদের পানি প্রবাহিত হয়ে আসছে। জুগীর খালের এক প্রান্ত আন্ধারমানিক নদে মিলেছে। আরেক প্রান্ত মিলেছে মাখিমারা খালে। জুগীর খালই তাদের জীবিকার জোগান দেয়। তাই জুগীর খালটি অন্য খালের চেয়ে স্থানীয় কৃষকদের কাছে আলাদা গুরুত্ব বহন করে।

কৃষকরা জানান, প্রায় আড়াই কিলোমিটার দীর্ঘ জুগীর খাল। কুমিরমারা গ্রামে খালটির বিভিন্ন অংশে আড়াআড়ি করে বাঁশের ওপর জাল দিয়ে আটকে প্রভাবশালী কয়েকটি পরিবার মাছ ধরতেন। ফলে পানি প্রবাহে বিঘœ ঘটতো। দখলদারদের কারণে গ্রামের বাসিন্দারা খালের পানি ব্যবহার করতে পারতেন না। খালের পানি ছাড়া অন্য কোনো সেচের ব্যবস্থা নেই, তাই বর্ষা মৌসুমে আমন ছাড়া বছরের অন্য সময়গুলো আবাদ হতোনা। সেচের অভাবে বিপুল পরিমাণ জমি অনাবাদি পড়ে থাকতো। ফলে সেসময় গ্রামগুলোর অধিকাংশ পুরুষ মানুষ কাজের সন্ধানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলে যেতেন। দুই যুগের বেশি সময় ধরে এভাবেই চলছিল গ্রামের মানুষগুলোর বেচে থাকার লাড়াই। তবে অসহায় মানুষগুলো স্বপ্ন দেখতেন খাল দখলদার মুক্ত হওয়ার। দিনে দিনে গ্রমাবাসীরা খালের পানি জমিতে সেচ কাজে ব্যবহারের দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। শুরু হয় খাল দখলমুক্ত করার লড়াই। সেই লড়াইতে গ্রামবাসীর সঙ্গী হন কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও)। প্রায় দুই যুগ পর গ্রামবাসী ও ইউএনও’র সম্মিলিত চেস্টায় প্রভাবশালীদের হাত থেকে দখলমুক্ত হয় জুগীর খাল। খালের পানি ব্যবহারে তখন আর বাধা না থাকলেও দেখা দেয় আরেক সমস্যা ।

কৃষকরা জানান,খালের জলকপাটগুলো (স্লুইস গেট) জরাজীর্ন হওয়ায় জোয়ারের লোনা পানি ঢোকায় তারা আবাদ নিয়ে রীতিমতো চিন্তিত হয়ে পড়েন। ওই পানি দিয়ে জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব ছিল না। জলকপাটগুলো মেরামতের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সহ বিভিন্ন দপ্তরে ধরনা দিতে থাকেন তারা। কিন্তু কাজ হয়নি। এবারও তাদের সহায়তায় হাত বাড়িয়ে দেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও)। খালে বাধ নির্মানে সরকারী তহবিল থেকে ২৫ হাজার টাকা দেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও)। গ্রামের মানুষেরাও সাধ্যমতো চাঁদা চাদা দেন। এভাবে সংগ্রহ হয় ৪০ হাজার টাকা। সেই টাকা দিয়ে খালে লোনা পানির প্রবেশ ঠেকাতে নির্মান করা হয় ৩ টি বাধ। বাধগুলো নির্মানের ফলে গ্রামগুলোর কৃষিতে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। খালের আশপাশের প্রায় ৫০০ একর অব্যবহৃত জমিতে এবার দেখা যাচ্ছে সবুজের সমারোহ। স্থানীয় কৃষকেরা আবাদ করেছেন তরমুজ, লাউ, শিম, টমেটো, কপি, মুলা,মরিচ সহ নানা ধরনের সবজি। বোরোর আবাদ করেছেন প্রায় ৫০ একর জমিতে। একসময় তাদের শাকসবজি কিনে খেতে হতো। এখন উৎপাদিত সবজি শহরের বাজারে বিক্রি করেন। গ্রামজুড়ে কর্মমুখর পরিবেশ। কেউ বসে থাকেন না। নীলগঞ্জ ইউনিয়ন গোটা উপজেলার মধ্যে কৃষির পাশাপাশি সবজি চাষের মডেল ইউনিয়ন হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। জুগীর খাল সহ অন্য খালগুলোর কারণেই বলদে গেছে এসব গ্রামের মানুষের ভাগ্য।
হেমায়েত উদ্দিন বলেন, বিএ পাস করার পর চাকরি করার চিন্তা ছিল। তখন জমিতে সেচের অভাবে আশানুরূপ ফলন পাওয়া যেত না। এবার অবস্থা পাল্টেছে। কৃষকেরা চাষ করে লাভবান হচ্ছেন। তবে গ্রামের কৃষকরা একসময় হতাশায় ভুগছিলেন। তখন অলৌকিকভাবে পাশে এসে দাঁড়ালেন কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মুনিবুর রহমান। তার কাছে আমাদের ঋণের কোনো শেষ নেই, নেই কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা।

মজিদপুর গ্রামের লিটন হওলাদার জানান, একসময় তিনি ঢাকা ও বরিশালে গিয়ে দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালাতেন । তবে এখন অন্যের জমি বর্গা নিয়ে কৃষিকাজ করে সংসার চালাচ্ছেন। সবজি চাষাবাদ করে তার অভাব দূর হয়েছে।

নীলগঞ্জ আদর্শ কৃষক শ্রমিক সমবায় সমিতির সভাপতি সুলতান গাজী জানান, জমিতে সেচ দেয়ার জন্য আগে খালের পানি ব্যবহারের সুযোগ ছিল না। ফসলাদি ভালো হতো না বলে কুমিরমারা গ্রামে অভাব লেগেই ছিল। এক ফসলি জমি ছিল গ্রামবাসীর একমাত্র ভরসা। এখন কুমিরমারা সহ আশেপাশের আরো কয়েকটি গ্রামটির চিত্র বদলে গেছে।

সুলতান গাজী বলেন, খালের জলকপাটগুলো (স্লুইস গেট) জরাজীর্ন ছিল। জোয়ারের সময় লোনা পানি প্রবেশ করতো। সেই সমস্যা নিরসনে খালে বাধ দেয়া হয়েছে। খালে বাধ নির্মানে অর্থ দিয়ে সহায়তা করেছেন ইউএনও স্যার। বাধের কারনে এখন নোনা পানি ঠেকানো সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি খালগুলোতে মিঠা পানি সংরক্ষন করা গেছে। শুকনো মৌসুমে এসেও ওই পানি জমিতে সেচ দেয়ার জন্য ব্যবহার করা যাচ্ছে। ইউএনও স্যারের সহযোগিতা ছাড়া এসব সম্ভব ছিল না। তার এই ঋণ কোনো দিন শোধ করতে পারব না।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল মন্নান জানান, সেচের সুবিধা পেয়ে নীলগঞ্জ ইউনিয়নের অন্তত ২৬ টি গ্রামের ৫ শতাধিক একর জমিতে নতুন করে এবার আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫০ একর জমিতে বোরোর চাষ হয়েছে। বাকি জমিতে কৃষকেরা সবজির চাষ করছেন। সবজি আবাদ করে কৃষকেরা ব্যাপক সফলতা পেয়েছেনতিনি আরও বলেন, কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে গ্রামগুলোর কৃষকদের আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ ও রোগবালাই দমনের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মুনিবুর রহমান জানান, প্রশাসনের কাজ হচ্ছে জনসেবা করা। আমি শুধু আমার ওপর রাষ্ট্রের অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছি। গ্রামবাসীরাই সম্মিলিত প্রচেস্টায় চরম প্রতিকূলতাকে জয় করেছেন। রীতিমতো সংগ্রাম করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ তারাই করে নিয়েছেন। সহায়তা পেলে গ্রামের মানুষ তার আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন করতে পারে, নীলগঞ্জ ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর







ফেসবুক কর্নার

শিরোনাম
৯৯৯ নম্বরে ফোন করে ধর্ষণ থেকে রক্ষা পেল ভান্ডআগৈলঝাড়ায় কলেজ ছাত্রীকে ধর্ষণ। ৫ জনের বিরুদ্মনপুরা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদলের ৪২তম প্ফ্রান্সে বিশ্ব নবী হযরত মুহম্মাদ (সাঃ) কে অবমাবরিশাল বিএনপির অন্তঃকোন্দলের ছায়া যুবদলেও ॥ রিফাত হত্যা মামলায় অপ্রাপ্তবয়স্ক ১১ আসামির সঝালকাঠিতে পুলিশের বাধায় যুবদলের প্রতিষ্ঠাববরিশালে নৌ পু‌লি‌শের ওপর হামলাজানুয়ারিতে ক্লাস শুরুর পরিকল্পনা৫ দিন ইন্টারনেটের গতি কিছুটা ধীর থাকতে পারেমা দুর্গার বিসর্জনে ছিল না শোভাযাত্রা-আনন্দ গলাচিপায় বেপজার রপ্তানী প্রক্রিয়জাত অঞ্চল ককরোনায় পর্যটকদের কাছে কুয়াকাটার আকর্ষণ একটুপটুয়াখালীতে র‌্যাংগস ইন্ডাস্ট্রিজের র‌্যাংজেলা পরিষদ সদস্য ফিরোজ শিকদার কলাপাড়ার দূর্
%d bloggers like this: