বরিশাল ৩০শে আগস্ট, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ | ১৫ই ভাদ্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | ৬ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৭ হিজরি
বিপদগ্রস্ত শিশুদের সাহায্য করতে সমাজসেবা অধিদপ্তরের চালু করা চাইল্ড হেল্পলাইনে গত জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে সহায়তা চেয়ে ফোনকল এসেছে ২৬ হাজার ১০০টি। গত বছরের একই সময়ে হেল্পলাইনে ফোন এসেছিল ১৯ হাজার ২৬৫টি। গত বছরের তুলনায় এ বছর শিশু নির্যাতন ও সহিংসতার ঘটনায় সহায়তা চাওয়ার ঘটনা বেড়েছে প্রায় সাত হাজার।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যানেও শিশুর প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতনের ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ার চিত্র দেখা গেছে। তাদের তথ্যমতে, গত সাত মাসে নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৬৪০ শিশু। গত বছরের একই সময়ে নির্যাতনের শিকার হয়েছিল ৪৬৩ শিশু। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৩০৬ শিশু। আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ১৭৫। তার আগের বছর (২০২৩) একই সময়ে সহিংসতার ঘটনা ছিল ৬১৮ এবং ধর্ষণের শিকার হয় ১৯৪ শিশু।
গত সাত মাসে অবশ্য শিশুহত্যার ঘটনা আগের বছরের চেয়ে কিছুটা কমেছে। এই সময়ে ২৫৯ শিশুকে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হয়েছে। মা, বাবা, সৎমা, আত্মীয়, প্রতিবেশী এবং দুর্বৃত্তের হাতে প্রাণ গেছে তাদের। এর মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৪ জনকে। শারীরিক নির্যাতনে মৃত্যু হয়েছে ৭৫ জনের। নিখোঁজ থাকার পর লাশ উদ্ধার করা হয় ৩৫ শিশুর। গত বছরের একই সময়ে (সাত মাস) হত্যার শিকার হয় ৩২৫ শিশু। ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে নিহত শিশুরা এই পরিসংখ্যানে নেই। এর আগে ২০২৩ সালের প্রথম সাত মাসে খুন হয়েছে ২৯২ জন এবং ২০২২ সালে একই সময় খুনের সংখ্যা ২৯৩।
সমাজসেবা অধিদপ্তর পরিচালিত চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮-এ কল আসার চিত্রও উর্ধ্বমুখী। ২০২৪ সালে শিশু নির্যাতন ও সহিংসতা সংক্রান্ত কল ছিল ২০২৩ সালের চেয়ে প্রায় চার হাজার বেশি। ২০২৩ সালে কল এসেছিল ১৫ হাজার ৭৮৫টি, যা ২০২২ সালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। ২০২২ সালে নম্বরটিতে এ ধরনের অভিযোগ জানিয়ে কল এসেছে ৮ হাজার ২১টি।
শিশুর সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত এ হেল্পলাইনে নির্যাতন, আইনি সহায়তা, শারীরিক ও মানসিক সমস্যা, স্কুল-সম্পর্কিত বিষয়সহ নানা কারণে কল করে সাহায্য চায় শিশু নিজে বা তার মা-বাবা বা অভিভাবক বা অন্য কেউ।
বাংলাদেশ চাইল্ড হেল্পলাইনের ব্যবস্থাপক চৌধুরী মো. মোহায়মেন বলেন, গত জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত চাইল্ড হেল্পলাইনে শিশু-সংক্রান্ত চার লাখ ৯১ হাজার ২৬৭টি কল এসেছে। এর মধ্যে শিশু নির্যাতন ও সহিংসতার কল ছিল ২৬ হাজার ১০০টি। একই সময় গত বছরের প্রথম ৭ মাসে ফোন কল ছিল দুই লাখ ৪২ হাজার ১৯৫টি। সে হিসাবে ১০৩ শতাংশ ফোন বেশি এসেছে এবারের প্রথম সাত মাসে। প্রতিবছর এমন ফোনের সংখ্যা বাড়ছে বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশ পুলিশের ওয়েবসাইটে খুন, ডাকাতি, ছিনতাইসহ নানা ঘটনায় মামলার পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়। তবে সেখানে খুনের সংখ্যা থাকলেও শিশু খুনের ঘটনা আলাদাভাবে উল্লেখ করা নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারিবারিক অস্থিরতা, হতাশা, মানসিক অসুস্থতা, মাদকাসক্তি, দাম্পত্য টানাপোড়েনের কারণে অনেক অভিভাবক নিজের রাগ, ক্ষোভ ও হতাশা শিশুদের ওপর চাপাচ্ছেন। এ কারণে শিশু নির্যাতন বাড়ছে। এ থেকে উত্তরণে শিশুদের সঙ্গে আচরণ আরও সংযত ও মানবিক হতে হবে। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতা, শিশুদের জন্য নিরাপদ ও ভালোবাসাপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করার ওপর জোর দিয়েছেন তারা।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, শিশুদের হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনা পরিবারের ভেতরেই বেশি হচ্ছে। মা-বাবার মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েনও এর অন্যতম কারণ। তবে পরিবারের বাইরের যে হত্যাকাণ্ড ঘটছে, সেগুলোর নানা কারণ আছে।
আসকের জ্যেষ্ঠ সমন্বয়কারী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলেন, শিশুরা যখন মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়, তা শুধু আইন ও ন্যায়ের ব্যর্থতা নয়; বরং একটি রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক ব্যর্থতাও। এ প্রবণতা গভীর উৎকণ্ঠার। আমরা দ্রুততম সময়ের মধ্যে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ আশা করি। শিশুরা যখন নির্যাতনের শিকার হয়, তখন বুঝতে হবে আমরা শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারিনি।
আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলেন, এ বছর শিশুদের নির্যাতনের যে পরিসংখ্যান দেখছি, তা সত্যিই উদ্বেগজনক। আশা করেছিলাম, শাসন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসার পর হয়তো এ ধরনের ঘটনা কমে আসবে, তবে বাস্তবে তা হয়নি।
আপনজন কেড়ে নিচ্ছে প্রাণ
চলতি বছর যে ২৫৯ শিশু হত্যার শিকার হয়েছে, দৈবচয়নের ভিত্তিতে ২০টি খুনের ঘটনা সম্পর্কে খোঁজ নেয় সমকাল। সেখানে দেখা গেছে, মা-বাবা, সৎমা, আত্মীয়, প্রতিবেশী এবং দুর্বৃত্তের হাতে শিশুর প্রাণ গেছে বেশি, যাদের বয়স ১২ বছরের নিচে।
বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০টির মধ্যে ১২ ঘটনায় ১৬ শিশু খুন হয়েছে আপনজনের হাতে। পারিবারিক কলহের জেরে মা-বাবা, চাচার হাতে এসব খুনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে আলাদা দুই শিশুর প্রাণ যায় সৎমায়ের হাতে। সন্তানকে খুন করে বাবা আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন, এমন ঘটনাও আছে। তিনটি ঘটনায় যৌন নিপীড়নের পর তিন শিশুকে হত্যা করা হয়। অন্য তিনটি ঘটনায় পূর্বশত্রুতার জেরে প্রতিবেশীর হাতে তিন শিশুর প্রাণ গেছে। এ ছাড়া মোবাইল ফোনে গেম নিয়ে একজন এবং মাদক সেবন নিয়ে আরেক শিশু খুন হয়।
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. খায়রুল চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশে মানুষের যে নৈতিক শক্তি ছিল, তা আর আগের মতো নেই। সহিংসতা, দুর্নীতি সমাজকে অস্থির করে তুলছে। এমন পরিস্থিতিতে সমাজের যেমন দায়িত্ব আছে, তেমনি অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে। রাষ্ট্রের দিক থেকে আরও বেশি করণীয় আছে। কীভাবে জনগণকে সম্পৃক্ত করে শিশুদের বিষয়গুলোতে আরও সংবেদনশীলতা আনা যায়, রাষ্ট্রকে সে বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে।